নাইমুল ইসলাম, গৌরনদী প্রতিনিধিঃ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ঢাকা-বরিশাল জাতীয় মহাসড়ক আজ যেন অবহেলা ও দায়সারা সংস্কারের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। পদ্মা সেতু চালুর পর এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি সড়কের সক্ষমতা কিংবা টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ। ফলে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী, চালক ও ব্যবসায়ী চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। সাথে সাথে নিহত আহত হ হচ্ছেন এ সড়কের যাত্রীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভুরঘাটা থেকে বরিশাল নগরীর নতুল্লাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। কোথাও সড়কের অংশ নিচু হয়ে গেছে, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে উঁচু-নিচু অসমতল অবস্থা। অনেক স্থানে সংস্কারের জন্য ব্যবহার করা আস্ত ইটের বড় বড় অংশ এখনো মহাসড়কের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনের জন্য তৈরি হয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর অন্যতম দাবি ছিল ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা। কিন্তু বাস্তবে সেই দাবির কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। উল্টো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত, দেবে যাওয়া স্থান ও ভাঙাচোরা অংশ। কোথাও কোথাও বিটুমিন ও কংক্রিট ব্যবহার না করে নামমাত্র ইট-বালি দিয়ে সংস্কারের ফলে পাকা মহাসড়কের এখন গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার রূপ নিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরকে সামনে রেখে মহাসড়কের বিভিন্ন গর্ত দ্রুত ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে অনেক স্থানে স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে গর্তে আস্ত ইট দিয়ে রোলার কম্প্যাকশন করে গর্ত সংস্কার করা হয়। ভারী যানবাহনের অব্যাহত চাপে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ইট সরে গিয়ে আবারও আগের মতো গর্ত তৈরি হয়েছে এবং ইটের ভাঙা বড় বড় অংশ রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যা পরিবহন ও মোটরসাইকেলের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, একটি জাতীয় মহাসড়কের সংস্কার কি এভাবেই হওয়ার কথা? সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে বিটুমিন, কংক্রিট বা অন্যান্য টেকসই উপকরণ ব্যবহারের কথা, সেখানে সাময়িকভাবে ইট-বালু দিয়ে দায়সারা সংস্কার কতটা যৌক্তিক?
এ নিয়ে জনমনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মহাসড়ক সংস্কারের জন্য সরকার যে অর্থ বরাদ্দ দেয়, তা কি প্রকল্পের নকশা ও মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যয় হচ্ছে? বরাদ্দকৃত অর্থের বিপরীতে কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করার কথা? মাঠপর্যায়ে বাস্তবে কী কাজ হয়েছে? সংস্কারের গুণগত মান নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তদারকি কতটা কার্যকর ছিল?
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন। তাই দায়সারা সংস্কার নয়, প্রয়োজন প্রকৌশলগত মান বজায় রেখে টেকসই পুনর্বাসন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
দক্ষিণাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা—সংস্কারের নামে সাময়িক ধোঁকা নয়, একটি নিরাপদ, টেকসই ও আধুনিক মহাসড়ক। কারণ একটি জাতীয় মহাসড়কের দৃশ্য কখনোই গ্রামীণ ভাঙাচোরা রাস্তার মতো হতে পারে না।
