নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বরিশালের বাকেরগঞ্জে ১০নং রানিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেশমা আক্তার মিষ্টির ব্যাগে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ মিড-ডে মিলের ডিম ও রুটি পাওয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। শনিবার (২৭ জুন) সকালে বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও তাদের নজরে আসে। এরপর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন ও উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আসাদুজ্জামান, রাবেয়া খানম চৌধুরী ও নুসরাত জাহানের সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছেন। সে লক্ষ্যে আজ (গতকাল ২৭ জুন) সকালে বাকেরগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আসাদুজ্জামান, রাবেয়া খানম চৌধুরী ও নুসরাত জাহান সরজমিন পরিদর্শন করে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক, প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলেছেন। সে তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবরে দাখিল করা হয়েছে। যা আগামীকাল (আজ) বরিশাল জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবরে দাখিল করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন। জানা গেছে, বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরাদি ইউনিয়নের রানিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বিদ্যালয় ছুটির পর প্রধান শিক্ষিক রেশমা আক্তার মিষ্টি বাড়ি ফেরার সময় স্থানীয়রা তার বহন করা ব্যাগ তল্লাশির দাবি জানায়। একপর্যায়ে ব্যাগ খুলে দেখা হলে সেখানে ২৪টি ডিম ও ২২ পিস রুটি পাওয়া যায়, যা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ভাইরাল হয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রধান শিক্ষিকা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত ডিমসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী নিয়মিত নিজের বাসায় নিয়ে যেতেন। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়রা নজরদারি চালিয়ে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় ছুটির পর তার ব্যাগ খুলে দেখানোর অনুরোধ করেন। প্রথমে তিনি ব্যাগ দেখাতে অনীহা প্রকাশ করলেও স্থানীয়দের চাপে ব্যাগ খুলে দিলে ডিম ও রুটি উদ্ধার করা হয় বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত এলাকাবাসী। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও আশপাশে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই প্রধান শিক্ষিকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী নিয়মিত আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধে প্রথমে ব্যাগ দেখাতে অনীহা প্রকাশ করেন প্রধান শিক্ষিক। পরে তাদের চাপে ব্যাগ খুলে দিলে সেখান থেকে সরকারি বরাদ্দের ডিম ও রুটি বেরিয়ে আসে। বাকেরগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার আত্মসাতের অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষিকের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন সূত্র দাবী করেছে, ১০নং রানিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেশমা আক্তার মিষ্টির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরানো। বিদ্যালয়ের একাধিক অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সহকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, মাত্র তিন বছরের দায়িত্বকালেই তিনি বিদ্যালয়টিকে অনিয়মের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন। সরকারের ‘মিড ডে মিল’ বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের একটি অংশ নিয়মিত নিজের বাড়িতে নিয়ে যান প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ২০১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থীর খাবার আত্নসাত করে প্রধান শিক্ষিকা নিজের ব্যাগে ভরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এছাড়া প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি কোনো শ্রেণিতে নিয়মিত পাঠদান করেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের ক্লাস নেন শুধুমাত্র সহকারী শিক্ষকরা। কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও প্রধান শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে গিয়ে পাঠদান করেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সহকারী শিক্ষক বলেন, “হেড ম্যাডাম কোনো ক্লাস নেন না। তিনি অধিকাংশ সময় অফিসকক্ষে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। অফিসের অনেক কাজও আমাদের দিয়ে করিয়ে নেন। শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করা তার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।” তিনি টিও স্যারের শালী দাবী করে আমাদের ভয় দেখান। অভিযোগ রয়েছে, গত তিন অর্থবছরে বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ হওয়া ক্ষুদ্র মেরামত তহবিল, স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ), রুটিন মেরামত এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন খাতের বরাদ্দ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে পরীক্ষা গ্রহণের বিধান থাকলেও গত মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থীরা টাকা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। ৫০ টাকা আদায় করা শিক্ষার্থীরা হলেন ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সারা, লাবিবা, আকসা,মরিয়ম, তাসনিম, মারুফা, জুয়েনা, আরিফা, রিয়ামনি, মুনতাসির, তাছিন, জামিল, তায়েবা, সানি, মিম, সায়মা, আফ্রিদি, নাজমিন, তামিম, মারিয়া, বুশরা, শাহারিয়া, তাহসিন, রিফাত, ফাতেমা, খাদিজা, মাহিয়া, সানজিদা, হামিম, লিমনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে আদায় করেছেন প্রধান শিক্ষিকা রেশমা আক্তার মিষ্টি। একইভাবে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী মাবিয়া, আরাফাত, তিসা, রমজান, নাইমা, তাহিম, ইয়াসিন, সুমাইয়া, তাসলিমা, আয়াত, মাহিয়া, জারা, মুসকান, আলিফ, তাকিয়া, তাহনা, সুজন, জাবের নয়ন, ঋদ্ধি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষিকার নির্দেশে সহকারী শিক্ষকদের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি বিদ্যালয়ে নানা সুযোগ-সুবিধা থাকলেও প্রধান শিক্ষিকার অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার কারণে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
