ঢাকা সোমবার , ১৭ আগস্ট ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অচলাবস্থায় বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম

ভোরের অঙ্গীকার ডেস্ক
আগস্ট ১৭, ২০২৬ ৮:৩১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাবুগঞ্জ প্রতিনিধি।। বরিশালের বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতার কারণে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সমন্বয় এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবকরা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারের আত্তীকরণ নীতিমালার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রধান শিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থায়ী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে শিক্ষক সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষক সংকটের কারণে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের কারিগরি শাখার ক্লাস এবং কারিগরি শাখার শিক্ষকদের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রত্যাশিত সময়ে ও কাঙ্ক্ষিত মানে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিভাবকদের ভাষ্য, একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি হওয়ার পর শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় আরও উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে শিক্ষক সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।

বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রুটিন অনুযায়ী ক্লাস বণ্টন, কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা এবং সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি অভিভাবকদের।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল বলেন, “আত্তীকরণ নীতিমালার আওতায় বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে।”

বিদ্যালয়ের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের দাবি, ২০২৬ সালের আগে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে কঠোর ব্যবস্থা ছিল। সকাল ১০টার দিকে বিদ্যালয়ের গেট বন্ধ করে দেওয়া হতো এবং বিকেল ৪টায় ক্লাস শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ে গেট খোলা হতো। শ্রেণিশিক্ষকের অনুমতিপত্র ছাড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

অভিভাবকদের অভিযোগ, ২০২৬ সালের শুরু থেকে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ টিফিন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিরতির সময়ে গেট খোলা রাখা হচ্ছে। ফলে ওই সময়ে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন দোকানপাটে আড্ডা দিচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।

তবে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইব্রাহিম খলিল জানান, বাইরে থেকে খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে সবসময় তাজা খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর আগে বাইরে থেকে খাবার সরবরাহের কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। পরে স্কুল পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খাবার সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, আগামী সপ্তাহ থেকে শুধু ছাত্রীদের জন্য দুপুর ১টা থেকে ২টার মধ্যে বিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে নাস্তার ব্যবস্থা করা হবে।

বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমাউল হুসনা বলেন, বিষয়টি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয় করে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। খুব দ্রুত অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বাবুগঞ্জ উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ও বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য আরিফুর রহমান শিমুল সিকদার বলেন, প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের আগে প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্য হিসেবে তাদের নিয়মিত অংশগ্রহণ ছিল। নীতিগত কারণে বিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা থেকে তাদের দূরে সরে যেতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “তারপরও আমাদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যারা পরিচালনা পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটিকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, আমরা তা করব। প্রয়োজন হলে বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীনের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আরও গতিশীল ও কার্যকর করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখব।

ছাত্র অভিভাবক মো. শাহিদুর রহমান শাকিল বলেন, “বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি হওয়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে আগের মতো কোনো গভর্নিং বডি বা পরিচালনা পরিষদ নেই। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। ছাত্র-অভিভাবক ও স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা কম থাকায় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের সুযোগও সীমিত।”

তিনি আরও বলেন, শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা কিংবা শিক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয়ভাবে সমাধানের জন্য অভিভাবকদের কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। ফলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যেতে হয়। কিন্তু প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষে সবসময় বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরেক ছাত্র অভিভাবক আরাফাত হোসেন ফরিদ বলেন, ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো ও বাহ্যিক পরিবেশের উন্নয়ন হলেও শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কিছুটা অবনতি ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে মেধাবী ও কৃতী ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়া হতো। বর্তমানে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ের মধ্যেই মানসিক পরিতৃপ্তি তৈরি করত এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে উৎসাহব্যঞ্জক ভূমিকা রাখত।”

স্থানীয় অভিভাবকদের দাবি, বিদ্যালয়টি সরকারি হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষক সংকট, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি, শৃঙ্খলা এবং নীতিগত নানা জটিলতার কারণে সেই সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।

কয়েকজন অভিভাবক বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ তার পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো—বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অভিভাবকদের প্রত্যাশা, দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসন, প্রশাসনিক সমন্বয় বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

তাদের মতে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রশাসন ও স্থানীয় অংশীজনদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগই পারে বিদ্যালয়ের বর্তমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে একটি স্বাভাবিক, সুশৃঙ্খল ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।